
সিসি নিউজ ।। নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে দখলদারের হাত থেকে ‘বাফলার বিল’ রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে এলাকাবাসী। শনিবার দুপুরে উপজেলার রনচন্ডী ইউনিয়নের বাফলা গ্রামে ওই বিলের পাশে ঘন্টাব্যাপী পালিত কর্মসূচিতে ৫ শতাধিক নারী-পুরুষ অংশ নেন।
মানববন্ধন শেষে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন দক্ষিণ বাফলা দাশপাড়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি চাঁন কিশোর দাশ। এতে বক্তব্য দেন এলাহী বকস, মতিন চন্দ্র দাশ, কফি মামুদ, হাকিম উদ্দিন, আবু বক্কর সিদ্দিক, মোফাজ্জল হোসেন, দীপা রাণী দাশ প্রমুখ।
মৎস্যজীবী মতিন চন্দ্র দাশ বলেন, ‘গ্রামের দুইটি মৎস্যজীবী সমিতির সদস্যরা বিলটি লীজ নিয়ে মাছ চাষ করে। পাশাপাশি উম্মুক্ত ওই জলাশয়ে অনেকে মাছ ধরে জীবীকা নির্বাহ করছেন। এলাকার জনৈক প্রভাবশালী আমজাদ হোসেন ও তার পরিবার ভুয়া কাগজ পত্র তৈরী করে বিলটি দখলের পায়তারা করছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমজাদ হোসেন ভূমি মন্ত্রনালয়ের অডিট সুপার ছিলেন। সেই সুবাদে তিনি সহজে ভুয়া ওই কাগজপত্র তৈরীতে সক্ষম হয়েছেন। আমরা এর অবসান চাই।
গ্রামবাসী মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে আমরা বাফলার বিলে মাছ ধরে খাই। আমজাদ হোসেনের পরিবার এখন নাকি রেকর্ড করে নিয়েছেন। জেলেদের মাছ চাষের ঘেরের বেড়া তুলে দিয়ে মাছ বের করে দিয়েছে। বিলে বিষাক্ত ট্যাবলেট দিয়ে মাছ মেরে ফেলেছেন। জেলেদের মাছ শিকারে বাধা প্রদান করছে। উন্মুক্ত বিলটি ব্যবহারে তারা বছরে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবী করছেন।’
দীপা রাণী দাশ বলেন, ‘সরকারি ওই বিলে এলাকার মানুষ বংশ পরম্পরায় মাছ শিকার করে জীবীকা নির্বাহ করার কথা আমরা শুনেছি। এখন এলাকার একটি প্রভাবশালী পরিবার সেটি দখলের পায়তারা চালাচ্ছেন। তারা মাছ শিকারে নানা বাধা সৃষ্টি করছেন। বাধা না মানলে বিভিন্ন হয়রানীমূলক মামলায় ফাঁসাচ্ছেন।’
বাফলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি সাজেদুল ইসলাম এবং দক্ষিণ বাফলা দাশপাড়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি চাঁন কিশোর দাশ বলেন, ‘সরকারের কাছে লিজ নিয়ে আমরা ১৯৭৯ সাল থেকে ওই বিলে মাছ চাষ করে আসছি। ভূমি মন্ত্রনালয়ের সাবেক অডিটর আমজাদ হোসেন ভুয়া কাগজ তৈরী করে এখন আমাদের বিলের পানি ছুঁইতে দেয় না। তাঁর টাকা আছে, তাই অনেক ক্ষমতা। আমরা গরীব মানুষ আমাদের টাকা, ক্ষমতা কোনটারেই জোর নাই। আমরা সরকারের কাছে এর সুবিচার চাই।’
এ বিষয়ে রনচন্ডি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোখলেছুর রহমান বিমান বলেন, ‘বিলটি জমিদার দক্ষ মোহন ও তাঁর স্ত্রী চন্দ্র বালার জমিদারীর অংশ ছিল। ১৯৫০ সালে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হলে ওই জমি খাস হয়। স্থানীয় মৎস্যজীবীরা সরকারের কাছে লীজ নিয়ে সেখানে মাছ চাষ করে আসছেন। এটা সরকারি সম্পদ হওয়ায় সরকার এর দেখভাল করবে। আমজাদ হোসেনের সঙ্গে জেলেদের কি সমস্যা সে বিষয়ে আমি বলতে পারবো না।’
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাবেক নিরীক্ষক আমজাদ হোসেনের এবং বাফলা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি এখন ঢাকায় আছি। ১৯৪৭ সালে জমিদার আমার বাবার নামে পাঁচ দশমিক ৪০ একর এবং আমার চাচার নামে পাঁচ দশমিক ৪০ একর জমি দেয়। এর মধ্যে চার দশমিক ৬৯ একর জমি আমাদের নামে রেকর্ড করা হয়েছে। ১৯৬২ এবং বর্তমান হাল রেকর্ডে ওই জমি আমাদের নামে রেকর্ড করা আছে। তারা জোর করে আমাদের ওই জমিও খাস বলে দাবি করছেন।’ ঘের কেটে মাছ বের করে দেওয়া, বিলে বিষাক্ত ট্যাবলেট দিয়ে মাছ মেরে ফেলা এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ে চাকুরীর সুবাদে প্রভাব খাটিয়ে কাগজপত্র তৈরীর অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নূর-ই আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা আছে। সেখানে যে পরিমান সরকারি সম্পত্তি আছে তা উদ্ধারে কাজ চলমান আছে।’
উল্লেখ যে, ১৩৯ দশমিক ৩০ একরের সরকারি ওই বিলটি ঘিরে গ্রামের প্রায় চার শতাধিক মৎস্যজীবী পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে আসছে কয়েক যুগ ধরে। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে মৎস্য বিভাগ বিভিন্ন সময়ে সেখানে মাছের পোনা অবমুক্ত করে।